পুঁজিবাজার

কেপিসিএলের আড়াই কোটি শেয়ার হাতবদল নিয়ে প্রশ্ন

  • প্রকাশিত ২১ আগস্ট ২০২১

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ কোম্পানি কেপিসিএলের ৩ কোটি ২৩ লাখের বেশি শেয়ার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা জুলাই মাসে কীভাবে কিনল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, ঢাকা ও চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জে এই মাসে শেয়ার হাতবদল হয়েছে ৮০ লাখের কম। ব্লকেও লেনদেনের তথ্য নেই।

গত জুলাই মাসে ঢাকা ও চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হয়েছে মোট ১৫ কর্মদিবস। ওয়েবসাইটের হিসাব অনুযায়ী, এই ১৫ দিনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ বা ডিএসইতে মোট শেয়ার হাতবদল হয়েছে ৭৪ লাখ ১৮ হাজার ৬১০টি। আর চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জ বা সিএসইতে লেনদেন হয়েছে মোট ৫ লাখ ১ হাজার ৯০৬টি।

সব মিলিয়ে হয় ৭৯ লাখ ২০ হাজার ৫১৬টি।

অথচ ডিএসই ও সিএসই জুলাই মাস শেষে কেপিসিএলের শেয়ারের হিস্যা নিয়ে যে তথ্য দেয়া আছে, তাতে বলা আছে, এখন কেপিসিএলের মোট শেয়ারের ৮.৪৫ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ধারণ করে আছে। আর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে আছে ০.২১ শতাংশ।

জুন শেষে মোট শেয়ারের ০.৫২ শতাংশ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে। আর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে ছিল ০.০১ শতাংশ।

এই হিসাবে জুলাইয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কিনেছে ৭.৯৩ শতাংশ, আর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিনেছে ০.২০ শতাংশ।

৩৯৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিতে মোট শেয়ার সংখ্যা ৩৯ কোটি ৭৪ লাখ ১৩ হাজার ১৭৯টি।

এই হিসাবে জুলাই মাসে ৩ কোটি ১৫ লাখ ১৪ হাজার ৮৬৫টি শেয়ার কিনেছে। আর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিনেছে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৮২৬টি।

অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মিলিয়ে এই মাসে কিনেছে মোট ৩ কোটি ২৩ লাখ ৯ হাজার ৬৯১টি শেয়ার।

মোস্তাফিজুর রহমান নামে একজন বিনিয়োগকারী প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে বাকি ২ কোটি ৪৩ লাখ ৮৯ হাজার ১০৩টি শেয়ার কীভাবে, কোথায় বিক্রি হলো।

কোম্পানির পক্ষ থেকে ডিএসই ও সিএসইতে যে হিসাব দেয়া হয়, তাতে পাবলিক মার্কেটের বাইরে ব্লক মার্কেটে লেনদেনের হিসাব থাকে না। অবশ্য জুলাই মাসে ডিএসইর ব্লক মার্কেট ঘেঁটে কেপিসিএলের শেয়ার লেনদেনের কোনো তথ্য মেলেনি।

মাস দুয়েক আগে যখন কেপিসিএলের বন্ধ হয়ে যাওয়া দুই কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, তখন মে ও জুন মাসে কোম্পানিটির প্রায় সব শেয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিক্রি করে দিয়েছিল। এরপর কোম্পানিটির দাম পড়ে যায়। আর জুলাইয়ে কম দামে সেই শেয়ার আবার কিনেছে তারা।

গত এপ্রিল শেষেও কোম্পানির মোট শেয়ারের ৯.২ শতাংশ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে। আর ০.৩০ শতাংশ ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে।

তবে মে ও জুন মাসে এই শেয়ারের প্রায় পুরোটাই বিক্রি করে দেয়া হয়।

৩০ মে শেষে কোম্পানির শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমে দাঁড়ায় ১.৬৫ শতাংশ আর বিদেশি বিনিয়োগ কমে হয় ০.০২ শতাংশ।

জুন শেষে আরও কমে তাদের হিস্যা।

সিএসইর পরে ডিএসইও প্রকাশ করে যে, জুলাইয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ৭.৯৩ শতাংশ ও বিদেশি বিনিয়োগকারী ০.২০ শতাংশ শেয়ার কিনেছে

গত মে মাসে প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন শেয়ার বিক্রি করে, তখন শেয়ার মূল্য ৩৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪৩ টাকায় উঠেছিল।

জুন ও জুলাইয়ে ৩৭ ও ৩৯ টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে দর। এর মধ্যেই শেয়ারটি আবার কিনেছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা।

আগস্টে যখন প্রথমে টিচাগং স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার সংখ্যার হিসাবটি হালনাগাদ করা হয়, তখন নামে উল্লম্ফন ঘটে। ৩৭ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৪৫ টাকায় উঠে যায় দাম। বৃহস্পতিবার কোম্পানিটির শেয়ার দর খানিকটা কমে দাঁড়িয়েছে ৪২ টাকা ৬০ পয়সা।

আগস্টে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেনও বেড়েছে। কেবল আট কর্মদিবসে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১ কোটি ৬৮ লাখ ৬৪ হাজার ৭৭২টি, অর্থাৎ গত মাসের দ্বিগুণের বেশি।

মাসে ৮০ লাখের কম শেয়ার লেনদেন হলেও কীভাবে সোয়া তিন কোটি হাতবদল হলো, এমন প্রশ্নে কিছু বলতে পারেননি ডিএসই উপমহব্যবস্থাপক শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘কোম্পানি থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাই ওয়েবসাইটে দেয়া হয়। যদি এমন হয়ে থাকে, তাহলে রোববার ডিএসই খোলা হলে বিস্তারিত জানাতে পারব।’

সিএসই সিনিয়র অফিসার ও মুখপাত্র তানিয়া বেগম বলেন, ‘বিএসইসি নির্দেশনা অনুযায়ী মাসের ৫ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে কোম্পানির শেয়ার হোল্ডিং বিষয়ে ডিএসই সিএসইকে জানাতে বলা আছে। সে অনুযায়ী আমাদের কাছে কোম্পানি যেসব তথ্য সরবরাহ করে সে অনুযায়ী আমরা ওয়েবসাইটে দিয়ে থাকি।’

ঘটনাটি কীভাবে ঘটল- এমন প্রশ্নে কেপিসিএলের প্রধান হিসাব কর্মকর্তা সোহরাব আলী খান বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব কোনো ডাটা নেই এখানে। কোম্পানির শেয়ার ধারণের তথ্য তা আমরা সিডিবিএল থেকে নিয়ে থাকি এবং সে অনুযায়ীই তা ডিএসই ও সিএসইকে সরবরাহ করা হয়।’

শেয়ার কেনাবেচা ও মালিকানা পরিবর্তন হলে তা নিশ্চিত করাই সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড বা সিডিবিএলের কাজ। দুই স্টক এক্সচেঞ্জে কেপিসিএলের যত শেয়ার লেনদেন হয়েছে, তার চেয়ে বেশি লেনদেনের হিসাব কীভাবে এলো- এমন প্রশ্নে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও শুভ্র কান্তি চৌধুরীও কিছু জানাতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি না দেখে কিছু বলতে পারব না।’

খুলনা পাওয়ার কোম্পানি বা কেপিসিএল নিয়ে বিনিয়োগকারীরা গত কয়েক মাস ধরেই চিন্তিত। গত মে মাসে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর এখন কেবল একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৩৫ শতাংশ মালিকানার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের।

অবশ্য কেন্দ্র দুটির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। আর এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিও। খোদ সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। আর এই চেষ্টার সুফল মিলতে যাচ্ছে বলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বিশেষ শর্তে কেপিসিএলের দুই কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। সিদ্ধান্ত হয়েছে, আরও দুই বছরের জন্য দুটি কেন্দ্র চালু থাকবে। তবে যতটুকু বিদ্যুৎ কেনা হবে, কেবল ততটুকুর জন্য অর্থ পাবে কেপিসিএল। অর্থাৎ আগের মতো কেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দেবে না সরকার।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সায় পাওয়ার পর সম্প্রতি তা পাঠানো হয় এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি)। সেখান থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর তা পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ে। আর মন্ত্রণালয় সেটি চূড়ান্ত করে সরকারপ্রধানের দপ্তরে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

গত মে মাসে কেপিসিএলের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এরপর মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করে তারা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সব সংস্থার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ফাইলটি এখন একজন যুগ্ম সচিবের কাছে আছে। শাটডাউনের সময় জরুরি ও নিয়মিত ফাইল ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অন্য কোনো ফাইল পাঠানো হয়নি। তবে এটি যেকোনো দিন পাঠানোর মতো অবস্থায় আছে।

দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন অনুমোদনের বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত আছে কি না, এমন প্রশ্নে সেই কর্মকর্তা বলেন, ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পে ভিত্তিতে এটি অনুমোদনের বিষয়ে আগেই কথা হয়েছিল। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনও এতে আপত্তি জানায়নি। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই পর্যায়ে ফাইল পাঠালে তা অনুমোদন না হওয়ার কারণ নেই।’

কেপিসিএলের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা সোহরাব আলী খান বলেন, ‘প্ল্যান্ট দুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে এখনও কোনো সরকারি নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পেরেছি প্ল্যান্ট দুটির মেয়াদ বাড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি হচ্ছে জেনেছি। তবে আমাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি।’

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কারা

পুঁজিবাজারে ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি সক্রিয় অংশগ্রহণ করে থাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। পুঁজিবাজারে তাদের সবচেয়ে দক্ষ বিনিয়োগকারী হিসেবে দেখা হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হচ্ছে মূলত অনুমোদিত স্টক ডিলার, স্টক ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য বা ব্রোকারেজ হাউস। এ ছাড়া ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, কাস্টডিয়ান, ট্রাস্টি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলো পুঁজিবাজারের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে পরিচিত।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক বা তফসিলি ব্যাংক পুঁজিবাজারে যে বিনিয়োগ করে থাকে, তাদেরও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০১০ সালে পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির শেয়ার বিক্রি হয় গড়ে ২১১ টাকায়। এটি যে মেয়াদি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর তা বন্ধ হয়ে যাবে, সে বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের কোনো ধারণা ছিল না।

সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড পায়রার দেড় শ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র, যাতে কেপিসিএলের মালিকানা ৩৫ শতাংশ
কোম্পানিটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল মোট তিনটি। এর মধ্যে ২০১৮ সালে একটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বিষয়টি জানতে পারে।

এরপর থেকে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের আয়ে লভ্যাংশ পেয়ে আসছে বিনিয়োগকারীরা। এই দুটির মধ্যে ১১৫ মেগাওয়াটের কেপিসিএল-১-এর মেয়াদ শেষ হয় গত ৩১ মে। আর ৪০ মেগাওয়াটের নওয়াপাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হয় ২৮ মে।

গত ২০ মে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়াতে আমাদের চেষ্টা-তদবির অব্যাহত রয়েছে।’

মেয়াদ শেষে কেন্দ্র দুটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই চেষ্টা-তদবিরের কতটা এগোল, সে বিষয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি।

আরও পড়ুন



Arthobazar