পুঁজিবাজার

এমারেল্ডের উৎপাদনে ফেরাতে বিএসইসির উদ্যোগ

  • প্রকাশিত ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১

ঘোষণা দিয়েও এমারেল্ড অয়েল যে জটিলতায় উৎপাদনে যেতে পারেনি, তার সমাধানে হাত বাড়িয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।

কোম্পানিটির আগের পর্ষদের নেওয়া ঋণের সুদ মওকুফে বেসিক ব্যাংককে অনুরোধ করেছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান শিবলী-রুবাইয়াত উল ইসলাম। ব্যাংকটিও তা মেনে নিয়েছে বলে জানাচ্ছেন সেই বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক পক্ষ।

বেসিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মালিকপক্ষ উধাও হয়ে যাওয়ায় ২০১৬ সাল থেকে উৎপাদন বন্ধ এমারেল্ড অয়েলের। পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা শেয়ারধারীরা আশায় বুক বাঁধছেন বিএসইসির উদ্যোগে।

যে ১২টি বন্ধ ও লোকসানি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে সেগুলোতে প্রাণ ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, তার মধ্যে একটি এই এমারেল্ড।

জাপান প্রবাসী বাংলাদেশির কোম্পানি মিনোরি বাংলাদেশ এই কোম্পানির নতুন ব্যবস্থাপনায় এসেছে। তারা শেরপুর সদরে কারখানাটি সংস্কার করে উৎপাদনে নিয়ে আসার পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। গ্যাস সংযোগ চালুর বিষয়ে তিতাস গ্যাসের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। টাকা জমা দিলেই গ্যাস পাওয়া যাবে। বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও আর জটিলতা নেই।

তবে সমস্যা ছিল বেসিক ব্যাংকের ঋণ নিয়ে জটিলতা। আগের পর্ষদ যে ঋণ নিয়েছিল, তা সুদ আসলে ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। মিনোরি চাইছিল সুদ মওকুফ সুবিধা। আর কোম্পানির শেয়ারের বিনিময়ে তারা ঋণের দায়ভার নিতে চাইছে। অন্যদিকে বেসিক ব্যাংক সুদ মওকুফের বিষয়ে রাজি ছিল না। পাশাপাশি তারাও আগের পর্ষদের শেয়ারের মালিকানা চাইছিল।

মতভিন্নতা মেটাতে পরে মিনোরি যোগাযোগ করে বিএসইসির সঙ্গে। আর গত মঙ্গলবার রাতে বেসিকসহ তিন পক্ষে বৈঠক হয় চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত এর উপস্থিতিতে।

মিনোরি বাংলাদেশের পরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, আলোচনায় বেসিক ব্যাংকের ঋণ জটিলতা নিয়ে কথা হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে ব্যাংকের কাছে সুদ মওকুফের জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম। বিএসইসি চেয়ারম্যানও একই বিষয়ে কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, বৈঠকে বেসিক ব্যাংকের প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় ভালো হয়েছে। আশা করি আমরা কোম্পানিটি চালু করতে পারব।

বিষয়টি নিয়ে বেসিক ব্যাংকের বক্তব্য জানা যায়নি। তবে বিএসইসি অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, বৈঠকে কোম্পানিটির বেসিক ব্যাংকের যে ঋণ জটিলতা আছে সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কোম্পানির পক্ষ থেকেও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। আশা করি সব সমাধান হয়ে যাবে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান শিবলী-রুবাইয়াত উল ইসলাম বলেছেন, কোম্পানিটিকে উৎপাদনে আনতে তারা সব রকম সহায়তা করবেন
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, কোম্পানিটির শেয়ার নিয়ে জটিলতা আছে সেটি মনে হয় আর হবে না। ব্যাংকের সঙ্গে কিছু সমস্যা আছে। আমরা তাদের বলেছি, আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করব।

বিএসইসি পর্ষদ পুনর্গঠনের আগে যারা মালিকানায় ছিলেন, তাদের হাতে এখনও কোম্পানিটির ২৫ শতাংশের মতো শেয়ার আছে। মিনোরি বাজার থেকে কিনেছে ৮ শতাংশের কিছু বেশি শেয়ার। তারা আগের পর্ষদ সদস্যদের শেয়ারের মালিকানা চায়। এর বিনিময়েই কারখানাটির যে ঋণ আছে, তার দায়িত্ব নিতে তারা আগ্রহী।

বৈঠকের পর আফজাল হোসেন বলেন, ব্যাংক ঋণের বিষয়টি সমাধান হয়ে গেলে শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়টিও সমাধান হয়ে যাবে। আগের যে চেয়ারম্যান, তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। বিষয়টি সমাধানে প্রয়োজনে আমরা অ্যাম্বাসির সহযোগিতা নেব।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, শেয়ার হস্তান্তরে কোনো জটিলতা হবে না। এটা আমরা নিশ্চিত করব।

গত ৩ মার্চ সাবেক সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হককে চেয়ারম্যান করে নতুন পর্ষদ করা হয় এমারেল্ড অয়েলের।

পর্ষদের অন্য স্বাধীন পরিচালকরা হচ্ছেন বিআইবিএমের প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম সারওয়ার, সজিব হোসেইন ও সন্তোষ কুমার দেব।

তবে শহিদুল হক পর্ষদ থেকে সরে গেছেন অন্য একটি কারণে। তিনি একটি ব্রোকারেজ হাউজের লাইসেন্স নিয়েছেন। ফলে কোনো কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে থাকতে চাইছেন না।

এই পরিস্থিতিতে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সাবেক অতিরিক্ত সচিব শফিকুল ইসলামকে।

শফিকুল ইসলাম এর আগে পর্ষদ পুনর্গঠন করা আলহাজ্ব টেক্সটাইলকে উৎপাদনে নিয়ে আসতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

গত ২৬ আগস্ট ঢাকা ও চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জকে এমারেল্ড অয়েল জানায়, ১ সেপ্টেম্বর থেকে তারা উৎপাদন শুরু করতে পারছে না। এর কারণ হিসেবে, করোনার সময় বেশ কিছু অফিস বন্ধ থাকায় তারা কয়েকটি লাইসেন্সের কাজ করতে না পারার কথা জানানো হয়।

পরিচালক আফজাল হোসেন জানান, এই লাইসেন্সগুলো রপ্তানিসংক্রান্ত।

তিনি বলেন, ইএফসি, আইএফসি, এনার্জি রেগুলেটরির লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে। তিনটি লাইসেন্স নবায়ন না করলে আমরা উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করতে পারব না। আবার শেয়ার ট্রান্সফার না হলে এ তিনটি লাইসেন্সও নবায়ন করা সম্ভব হবে না। তাই উৎপাদন শুরু করার আগে এই বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

লাইসেন্স করতে আর কত দিন লাগবে- এই প্রশ্নে আফজল বলেন, এখন আমরা শেয়ার হস্তান্তরকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। লাইসেন্সের কাগজপত্র জমা দেয়া আছে। এগুলো প্রক্রিয়াধীন আছে।

শেরপুর পৌরসভার শেরীপাড়ায় এমারেল্ডের কারখানা অবস্থিত। গত দুই মাস ধরেই সেখানে কর্মযজ্ঞ চলছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া যন্ত্রপাতির যা যা নষ্ট হয়েছে, সেগুলোর মেরামতকাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন আফজাল হোসেন।

এমারেল্ড অয়েলের ধানের কুঁড়ার তেল স্পন্দন ছয় বছর আগে দেশের বাজারে সাড়া ফেলেছিল
তিনি বলেন, ফ্যাক্টরিতে গ্যাস-সংযোগের জন্যও তিতাসের সঙ্গে কথা হয়েছে। টাকা পরিশোধ করলে লাইন সংযোগ দেয়া হবে। এটি পেতে আরও মাসখানেক সময় লাগবে। এটি আসার পর আমরা ১৫ দিনের ট্রায়াল দেব। এরপর পরিপূর্ণ উৎপাদনের যেতে আরও কিছু সময় প্রয়োজন হবে।

এমারেল্ড অয়েল ২০১৪ সালে ১০ টাকা করে অভিহিত মূল্যে দুই কোটি শেয়ার বিক্রি করে ২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে পুঁজিবাজার থেকে। কোম্পানিটি ধানের কুঁড়া থেকে তেলের ব্র্যান্ড ‘স্পন্দন’ বাজারে বেশ সাড়া ফেলেছিল।

তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার দুই বছর পর রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি মামলার কারণে ২০১৬ সালের ২৭ জুন থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় কোম্পানিটির। মামলার আসামি হয়ে মালিকপক্ষ উধাও হয়ে যায়।

শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বিএসইসি এ রকম রুগণ বেশ কিছু কোম্পানিকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পর্ষদ পুনর্গঠন করে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগের পর এরই মধ্যে উৎপাদন শুরু হয়েছে আলহাজ টেক্সটাইলে, ডুবে যাওয়া রিংসাইন টেক্সটাইলেও শুরু হয়েছে পরীক্ষামূলক উৎপাদন।

এমারেল্ড উৎপাদনে এলে এটা হবে তৃতীয় কোম্পানি, যেটিকে ডুবে যাওয়া থেকে টেনে তোলা হয়েছে।

আরও পড়ুন



Arthobazar