পুঁজিবাজার

বিডি থাই ফুডের আইপিও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন?

  • অর্থবাজার প্রতিবেদন
  • প্রকাশিত ২৫ নভেম্বর ২০২১

চার বছরের পুরানো আর্থিক হিসাব দিয়ে কী বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড শেয়ারবাজার থেকে অর্থ তোলার অনুমোদন পেয়েছে? এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

উল্লেখিত প্রতিষ্ঠান নিয়ে একটি আর্থিক বিশ্লেষনমূলক প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্যে বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই এবং ওই কোম্পানির ওয়েবসাইট খুজেঁ যে প্রসপেক্টাসটি পাওয়া গেছে সেখানে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন আছে ৩০-০৬-২০১৮ পর্যন্ত। অথচ থাকার কথা অন্ততঃ ৩০-০৬-২০২১ না হলেও অন্ততঃ ৩১-১২-২০২০ পর্যন্ত। এক্ষেত্রে সাধারণের কাছে ২টি প্রশ্ন জেগেছে; (ক) ৩ বছরের পুরানো হিসাব দিয়েই কি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব পাস হয়েছে?; (খ) প্রাথমিক গণপ্রস্তাব পাস করার ব্যাপারে কোনো অবৈধ প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে কি-না, কেননা প্রতিষ্ঠানটির সাথে সরকারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত!

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের পারিবারিক কোম্পানি বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও)মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ১৫ কোটি টাকা তোলার অনুমোদন দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)।তবে দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি হওয়ায় শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ন্যূনতম ১ টাকায় উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত এর উদ্যোক্তা-পরিচালকরা কোনো লভ্যাংশ গ্রহণ করতে পারবেন না, এমন শর্ত দিয়েছে কমিশন।

যাই হোক তি বছরের পুরানো হিসাব বিশ্লেষন করে যে অসঙ্গতি বা সংশয় দেখা দিয়েছে তা নিম্নরুপঃ

১। বিডি থাই ফুড ২০১৩ সালের আগস্ট থেকে ব্যবসা শুরু করার পর থেকে আজ পর্যন্ত তার শেয়ারহোন্ডারদের সামান্য লভ্যাংশ প্রদান করেনি। কাজেই তারা পুঁজিবাজারে এসে সাধারণ শেয়ারহোন্ডারদের যে কী দেবে তা সহজেই অনুমেয়।

২। ৩০-০৬-২০১৬ সমাপ্ত বছরে ইপিএস ছিল ২.৭৮ টাকা যা পরবর্তী বছরে ৯.৮১ টাকা হয় যদিও পরিশোধিত মূলধন সমান। ইপিএস তার পরবর্তী বছরে হয় মাত্র ৭৭ পয়সা। এই ধরনের ট্রেন্ড একেবারে অস্বাভাবিক যা আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

৩। প্রতিষ্ঠানটির মোট জমির পরিমান ৪৫২.২৫ শতাংশ কিন্তু বন্দক দেওয়া হয়েছে ৪১৫.৩৫ শতাংশ। বাকি ৩৬.৯০ শতাংশের কি সমস্যা?

৪। ১১.১৩ কোটি টাকার জমির মূল্য পুর্নমূল্যায়ন করে ২০.৭৬ কোটি করা হয়েছে। যার ফলে মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ৯.৬৪ কোটি টাকা অর্থ্যাৎ প্রায় ৮৭% মূল্যবৃদ্ধি। বিগত ১০ বছরে জমির মূল্য আসলে কত ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে?

৫। ৩০-০৬-২০১৮ তারিখে সমাপ্ত বছরে কোম্পানির বিক্রয় ছিল ৭৬.৩৪ কোটি টাকা। মজুদ পণ্য ৩৭.১৮ কোটি, পাওনা ১৩.৬৮ কোটি, অগ্রীম প্রদান ১৬.৪০ কোটি, নগদ অর্থ ৬.৫২ কোটি। অগ্রণী ব্যাংকের ১৪.৫০% সুদে লোন নিয়ে একটি কোম্পানি ১৬.৪০ কোটি টাকা অগ্রীম প্রদানসহ নগদে হাতে ৬.৫২ কোটি টাকা কীভাবে ধারণ করে তা বোধগম্য নয়। কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক অদক্ষতা প্রতিয়মান হয়েছে।

৬। কোম্পনিটিতে কর্মচারী হিসেবে কোনো পেশাদারী হিসাববিদ বা সচিব নেই কাজেই সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সুশাসন কীভাবে নিশ্চিত হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এসব কারণে শেয়ারবাজারে কোম্পানিটি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলবে এবং রেগুলেটরদের মারাত্মকভাবে বিতর্কিত করবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।

এ ব্যাপারে বিডি থাই ফুডের কোম্পানি সেক্রেটারি হাবিবুর রহমানকে মোবাইলে ফোনে কয়েকদিন কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। এমনকি মেসেজ পাঠালেও তার জবাব দেননি।

এ ব্যাপারে বিএসইসি’র নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, বিএসইসির কাছে কোম্পানিটি আপডেট কাগজ জমা দিয়েছে। তবে অন্যান্য বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। কী কারণে কোম্পানিটি আপডেট প্রসপেক্টাস তাদের ওয়েবসাইটে রাখেননি সে ব্যাপারে খবর নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।

বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ উদ্যোক্তা শেয়ার রয়েছে। এ ছাড়া কোম্পানিটিতে জাহিদ মালেকের দুই সন্তান রাহাত মালেক ও সিনথিয়া মালেকের যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩২ ও শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এর বাইরে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান জাহিদ মালেকের বোন রুবিনা হামিদের শেয়ার রয়েছে ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। রুবিনা হামিদের স্বামী কোম্পানির পরিচালক কাজী আকতার হামিদের ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ ও সন্তান রায়ান হামিদের ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ উদ্যোক্তা শেয়ার রয়েছে। এর বাইরে তাদের মালিকানাধীন সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স ও বিডি থাই অ্যালুমিনিয়ামের ২৪ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা রয়েছে কোম্পানিটিতে।

বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজের পরিশোধিত মূলধন হচ্ছে ৬৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যার মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ৬০ দশমিক ১৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। অবশ্য উদ্যোক্তা-পরিচালকসহ বিদ্যমান সব শেয়ারের ওপর তিন বছরের লক-ইন দিয়েছে এসইসি।

এসইসি জানিয়েছে, বিডি থাই ফুডসের ২০২০ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া নেট অ্যাসেটভ্যালু হয়েছে ১২ টাকা ৮২ পয়সা ও পুনর্মূল্যায়নসহ ১৪ টাকা ২৩ পয়সা। এ ছাড়া গত ৫ বছরের ভারিত গড় হারে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৬৩ পয়সা। নিট মুনাফায় দুর্বলতা কাটিয়ে না ওঠা পর্যন্ত আইপিও পূর্ব শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এসইসি। আইপিওর মোট শেয়ারের ১৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের ইস্যু করা যাবে, যা ২ বছর লক-ইন থাকবে।

 

আরও পড়ুন



Arthobazar