পুঁজিবাজার

১০ লাখ টাকার মামুন অ্যাগ্রো দশ মাসে ৪০ কোটি টাকার কোম্পানি!

  • অর্থবাজার প্রতিবেদন
  • প্রকাশিত ১৫ জানুয়ারি ২০২২

পুঁজিবাজার থেকে অর্থ তোলার অনুমোদন পাওয়া মামুন অ্যাগ্রোর আর্থিক প্রতিবেদনে ভয়াবহ গোজামিল তথ্য পাওয়া গেছে।

মামুন অ্যাগ্রো প্রডাক্ট লিমিটেড ২০০৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১০ লাখ টাকা মূলধন নিয়ে পরিচালিত হয়। অথচ ২০১৯ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর এই ১০ মাসে মূলধন হুট করে বেড়ে ৩৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা হয়ে যায়। কোম্পানিটি ১৬ বছর ধরে চলতে পারলো ১০ লাখ টাকা মূলধন নিয়ে আর এক বছরে তার মূলধন দাঁড়াল ৪০ কোটি টাকা। অধিকাংশ স্থায়ী সম্পত্তির বৃদ্ধিও ঘটেছে এই বছরে।

এত বড় মূলধন বাড়ার বছরে তাদের বিক্রয় ছিল ৪২ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং মূলধন বৃদ্ধির পরের বছরে বিক্রয় হলো ৪৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা অর্থ্যাৎ ৩৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা মূলধন বৃদ্ধি করে বিক্রয় বাড়লো মাত্র ৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

মামুন অ্যাগ্রোর প্রশাসনিক কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌসি ২.৮৫ কোটি টাকার বেশি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম ১.৯৫ কোটি টাকারও বেশী শেয়ার ক্রয় করেছেন।

এটি মূলত একটি পারিবারিক কোম্পানি। ২০০৩ সালে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু হয় এবং ২০১৬ সাল থেকে ১৮ সাল পর্যন্ত ৮.১৭ কোটি টাকা অগ্রীম শেয়ার মানি ডিপোজিট ছিল। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ৭০ হাজার টাকা মাত্র মাসিক বেতন পান এবং ২০০৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পরিচালকরা কোন নগদ লভ্যাংশ পাননি। তাহলে এত টাকা বিনিয়োগ করে দৃশ্যমান কোনো লাভ তোলা যায়নি। তাহলে পরিচালকরা শেয়ারবাজারে আসছেন ওই লাভ একবারে তোলার জন্য এটা সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।

প্রতিষ্ঠানটি এক বছরে ১০ লাখ টাকার মূলধন থেকে ৪০ কোটি টাকার মূলধনে পৌঁছা, যার ফলে বিক্রয় মাত্র ৪.৫৭ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাওয়া। ২ কর্মচারী কর্তৃক ৪.৮০ কোটি টাকার শেয়ারধারণ। কোম্পানির প্রতিষ্ঠা থেকে এখন পর্যন্ত এক টাকাও নগদ লভ্যাশ না দেওয়া। এসব ব্যপার জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে এবং চরম অস্বচ্ছতার রয়েছে বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

জমি ক্রয় :

প্রতিষ্ঠানের নিকট ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশিদ ২২৪ শতাংশ জমি বিক্রয় করেছেন ৫.৬০ কোটি টাকায় অর্থ্যাৎ শতাংশের দর পরেছে ২.৫০ লাখ টাকা। অপরদিকে চেয়ারম্যান নাসরিন জাহান বিক্রয় করেছেন ৮.২৫ শতাংশ জমি ৬.৫০ কোটি টাকায় অর্থ্যাৎ শতাংশের দর পরেছে ৭৮.৭৯ লাখ টাকা। চেয়ারম্যান কর্তৃক বিক্রয় মূল্যকে প্রতিবেদকের কাছে অত্যান্ত অশ্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে যা তদন্তের দাবি রাখে।

আর্থিক বিবরণী :

অ্যাগ্রো শিল্পতে ভ্যাট নেই এবং করের হার খুবই কম। কর অবকাশের সুযোগও এখানে রয়েছে। যার ফলে এসব শিল্পের আর্থিক বিবরণীরতে যথেষ্ট ম্যানিপুলেশনের সুযোগ রয়েছে এবং বর্তমানে এই ধরনের শিল্পের শেয়ারবাজারে আসার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

মামুন অ্যাগ্রোর ৩০-৬-২০২১ সমাপ্ত বছরে বিক্রয় বৃদ্ধি পেয়েছে ১২% কিন্তু চলতি সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২২% । বার্ষিক ৫২ কোটি টাকা বিক্রয়ের একটি কোম্পানির চলতি সম্পদ প্রায় ৪৯ কোটি টাকা। কোম্পানিটির বাকিতে বিক্রয়/ পাওনা ছিল ৩০-৬-২০২০ তারিখে ৯.৯০ কোটি টাকা যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩০-৬-২০২১ তারিখে হয়েছে ১৭.৫৬ কোটি টাকা অর্থ্যাৎ ৭৭% বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু উল্লেখিত সময় বিক্রয় বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ১২% । পাওনা টাকার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে মামুন অ্যাগ্রোর প্রকৃত বিক্রয় অনেক কম। তারা একটি ভাল আর্থিক বিবরণী তৈরির প্রয়োজনে বিক্রয়কে অনেক বড় করে দেখিয়েছে।

মামুন এগ্রোর ৩০ জুন ২০১৮ সাল থেকে ৩১ মার্চ ২০২১ সাল পর্যন্ত বার্ষিক ইপিএস যথাক্রমে ২.৬২ টাকা, ২.২৮ টাকা, ১.৬৬ টাকা ও ০.৯৮ টাকা। এই নিম্নগামী ইপিএস দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে শেয়ারবাজারে অনুমোদন পেয়েছে তা প্রশ্নবৃদ্ধ।

সুশাসন :

মামুন অ্যাগ্রোর চেয়ারম্যান মাত্র এসএসসি পাশ। এখানে কোনো পেশাধারী হিসাববিদ বা সচিব নেই। বিনিয়োগকারীদের নগদ লভ্যাংশ পাওয়ার কোনো ইতিহাস নেই এবং কোম্পানি থেকে তাদের আয় দৃশ্যমান নয়।

সার্বিক বিবেচনায় কোম্পানিটি অত্যন্ত দুর্বল এবং এর আর্থিক বিবরণীতে ব্যবসায়ের প্রকৃত দুর্বল চিত্রের প্রকাশ ঘটেনি বলে, যা শেয়ারবাজারকে শুধুই নিম্নগামী করবে।

এসব ব্যাপারে মামুন অ্যাগ্রোর কোম্পানি সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদের কাছে বক্তব্য জানতে চাইলে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

আগামী ২৩ জানুয়ারি কোম্পানির কিউআইওর আবেদন জমা নেওয়া শুরু হবে যা চলবে আগামী ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত।

এর আগে গত ২৮ অক্টোবর শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ৭৯৭তম সভায় কোম্পানিটির কিউআইও’র অনুমোদন দেওয়া হয়। কোম্পানিটি কিউআইও’র মাধ্যমে প্রতিটি ১০ টাকা মূলে ১ কোটি শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ১০ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। সংগৃহীত অর্থ দিয়ে কোম্পানিটি বিল্ডিং ও সিভিল নির্মাণ, চলতি মূলধন ও ইস্যু ব্যবস্থাপনা খরচ খাতে ব্যয় করবে।

কোম্পানিটির ২০২১ সালের ৩১ মার্চ সমাপ্ত ৯ মাসের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে ০.৯৮ টাকা এবং পুনঃমূল্যায়ন সঞ্চিতি ছাড়া শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৫.২৫ টাকায়।

এসএমই প্লাটফর্মে লেনদেনের তারিখ থেকে পরবর্তী ৩ বছর ইস্যুয়ার কোম্পানি কোনো বোনাস শেয়ার ইস্যু করতে পারবে না।

কোম্পানিটির ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে যথাক্রমে বিএমএসএল ইনভেস্টমেন্ট এবং উত্তরা ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট।

সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে যেসব ইনডিভিজ্যুয়াল ইনভেস্টর (রেসিডেন্ট অ্যান্ড নন-রেসিডেন্ট) এর বাজার মূল্যে বিনিয়োগের পরিমাণ ১ কোটি টাকা বা তদুর্ধ্ব সেসব ইন্ডিভিজ্যুয়াল ইনভেস্টর কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর হিসেবে বিবেচিত হবে।

এটি কোনো পাবলিক অফার নয়। বাংলাদেশে এসএমই প্লাটফর্মে তালিকাভুক্তির জন্য কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর অফার (কিউআইও)।

আরও পড়ুন



Arthobazar