পণ্যবাজার

নিত্যপণ্যের বাজারে বড় বিনিয়োগে যাচ্ছে প্রাণ-আরএফএল

  • অর্থবাজার প্রতিবেদন
  • প্রকাশিত ০৯ জানুয়ারি ২০২২

এবার বড় বিনিয়োগ নিয়ে ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, ডাল, লবণসহ নিত্যপণ্যের বাজারে আসছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ প্রাণ-আরএফএল। এর মাধ্যমে তারা ভোক্তাপণ্য বাজারের এ খাতে নেতৃত্ব দিতে চায়।

নিত্যপণ্য উৎপাদনের জন্য গাজীপুরের মোক্তারপুরে নতুন একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণ কাজে এরই মধ্যে অনেকদূর এগিয়েছে কোম্পানিটি। দুটি পোলট্রি খামার করছে মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জে। নরসিংদীতে করছে মোবাইল উৎপাদন কারখানা। পাশাপাশি গার্মেন্টস, ফুটওয়্যার ও গ্লাসওয়্যার কারখানা সম্প্রসারণের বড় উদ্যোগও নিয়েছে তারা।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কর্মকর্তারা জানান, কেবল ২০২২ সালেই অন্তত ১,৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এতে নতুন করে ২০,০০০ লোকের কর্মসংস্থান হবে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (সিইও) আহসান খান চৌধুরী বলেন, "স্থানীয় ভোক্তাচাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি বৃদ্ধি করা যাবে- এমন সব খাতে আমরা বিনিয়োগ করছি। এর মাধ্যমে আমরা কৃষি খাতের বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও সহায়তা দিতে চাই।"

শিল্পগোষ্ঠীটির পরিচালক (মার্কেটিং) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ভোগ্যপণ্যের বিশাল বাজারের বড় অংশে রয়েছে ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, সুজি, ডাল, চিনি, লবণের মতো নিত্যপণ্য। তবে আপাতত চিনি ছাড়া সব ধরনের নিত্যপণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে প্রাণ গ্রুপ।

কোম্পানি কর্মকর্তারা বলছেন, এরই মধ্যে সয়াবিন বীজ প্রক্রিয়াকরণ ও তেল পরিশোধন, আটা, লবণ, ডাল, স্টার্চ, ফিডমিলসহ কয়েকটি পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে গাজীপুরের মুক্তারপুরে কালিগঞ্জ এগ্রো প্রোসেসিং লিমিটেড (কেএপিএল) নামে নতুন একটি শিল্পপার্ক তৈরির কাজ করছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। চলতি বছর এখাতে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে গ্রুপটির। চলতি বছরের শেষ নাগাদ থেকে এখানকার কারখানায় উৎপাদিত পণ্য বাজারে আসতে পারে বলে তারা আশা করছেন।

বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্যের মোট বাজার ২০০ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৭ লাখ কোটি টাকা বলে এক গবেষণায় জানিয়েছে বৈশ্বিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান লাইট ক্যাসেল।

তবে লাইট ক্যাসেলের ওই গবেষণায় সব ধরনের 'কনজিউমার মার্কেটকে' হিসাব করা হয়। শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সেখানে আলাদা করা হয়নি।

দেশে বর্তমানে নিত্যপণ্যের বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে সিটি, মেঘনা, টি কে, বসুন্ধরা, এস আলম, আবুল খায়েরসহ কয়েকটি শিল্পগ্রুপ। এর মধ্যে সিটি গ্রুপ একাই বার্ষিক প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য কেনাবেচা করে।

হ্যান্ডসেট, গার্মেন্টস ও পোলট্রিতে বিনিয়োগ:

ভিশন ও ক্লিক ব্র্যান্ড নিয়ে দেশের ইলেকট্রিক বাজারে অনেক আগে থেকেই রয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। এবার প্রোটন ব্র্যান্ড নামে মুঠোফোন বাজারেও আনছে গ্রুপটি। এলক্ষ্যে নরসিংদীর প্রাণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে কারখানা স্থাপনের কাজ শেষ করেছে। ওই কারখানায় স্মার্ট ও ফিচার ফোনের পাশাপাশি হেডফোন, ব্যাটারি, চার্জারসহ বিভিন্ন ধরনের মোবাইল এক্সেসরিজ উৎপাদন করবে তারা।

দেশের ১২ হাজার কোটি টাকার মোবাইল ফোনের বাজারে স্যামসাং, সিমফনি, ওয়ালটন, ভিভো, অপো, রিয়েলমি, টেকনো, আইটেল, ইনফিনিক্স, ফাইভস্টার, নকিয়াসহ অন্যান্য ব্র্যান্ডের সাথে প্রতিযোগিতা করবে প্রাণের প্রোটন ফোন।

কামরুজ্জামান কামাল বলেন, "আমাদের কারখানার মাসে এক লাখ পিস স্মার্টফোন ও দেড় লাখ পিস ফিচারফোন তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। আগামী মার্চেই ক্রেতাদের হাতে প্রোটন ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন পৌঁছে দেওয়া যাবে।"

দেশে এগ্রো প্রসেসিং বা কৃষিজ পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে প্রাণ-আরএফএলকে অগ্রপথিক হলেও; সরাসরি পোলট্রি খামার ব্যবসায় ছিল না গ্রুপটি। তবে এবার মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে ১৫০ বিঘা জমিতে পোলট্রি শিল্প গড়ে তুলছে তারা। এজন্য ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণও শেষ করেছে। এখান থেকে বছরে ১৫ কোটি পিস ডিম ও ৩৬০ টন মুরগির মাংস সরবরাহের আশা করছেন গ্রুপটির কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দেশে পোলট্রি শিল্পের বাজার ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বর্তমানে প্রায় এক লাখের বেশি পোলট্রি ফার্ম রয়েছে। ছোট-বড় মিলিয়ে নিবন্ধিত প্যারেন্টস্টক ফার্ম বা হ্যাচারি গড়ে উঠেছে ২০৬টি। প্রতিদিন ডিম উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় সাড়ে চার কোটি পিস এবং মুরগির মাংস উৎপাদন হচ্ছে দিনে প্রায় তিন হাজার টন।

রাজশাহীর গোদাগাড়ির বরেন্দ্র শিল্পপার্কে ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগে বিভিন্ন ধরনের বিভিন্ন ধরনের অন্তর্বাস ও পোলো টি-শার্ট উৎপাদনেরও পরিকল্পনা রয়েছে প্রাণ-আরএফএলের। সেখানে প্রাথমিকভাবে ২,৫০০ গ্রামীণ নারীর কর্মসংস্থান হবে বলে জানিয়েছেন কামরুজ্জামান কামাল।

ফুটওয়্যার ও গ্ল্যাসওয়্যার কারখানা সম্প্রসারণ:

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কর্মকর্তারা মহামারির মধ্যেও ফুটওয়্যার এবং গ্লাসওয়্যার কারখানা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছেন।

নরসিংদী শিল্পপার্কে ফুটওয়্যার কারখানায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বিদ্যমান জুতা উৎপাদন সক্ষমতা ৬ লাখ জোড়া থেকে ৯ লাখে উন্নীত করা হবে। আর গ্ল্যাসওয়্যার কারখানায় ৫৫ কোটি টাকা বিনিয়োগে উৎপাদন ক্ষমতা তিনগুণ হবে।

বর্তমানে এখানে মাসে ২.৫ লাখ বর্গফুট গ্ল্যাস উৎপাদন করা যায়, নতুন বিনিয়োগের পর যা হবে সাড়ে সাত লাখ বর্গফুট।

দরিদ্র জনগণের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানি ও কৃষিকাজে সেচের পানি সরবরাহের উদ্দেশ্যে টিউবওয়েল ও কৃষি সহায়ক যন্ত্রপাতি তৈরির মাধ্যমে ১৯৮১ সালে রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেড (আরএফএল) এর মাধ্যমে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের যাত্রা শুরু হয় এর প্রতিষ্ঠাতা আমজাদ খান চৌধুরীর হাত ধরে। তিনি মাত্র ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ নিয়ে এ ব্যবসা শুরু করেন।

১৯৮৫ সালে নরসিংদীতে স্বল্প পরিসরে কলা, পেঁপে, আনারস, রজনীগন্ধা ইত্যাদি চাষ শুরু করে নাম লেখায় খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াকরণে। ওই সময় এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং কোম্পানি লিমিটেড গঠনের মাধ্যমে এ ব্যবসা শুরু করে।

সেই থেকে কোমল পানীয়, সস, জেলি, চানাচুর, চিপস, মশলা, চকলেট, বেকারি, হিমায়িত খাদ্য, ট্য়লেট্রিজ, দুগ্ধজাত, হাউজওয়্যার ও ইলেকট্রনিকস-সহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করার মাধ্যমে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ এখন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম।

বর্তমানে প্রাণের ১০ ক্যাটাগরিতে প্রায় ২ হাজার ৮০০ পণ্য রয়েছে। গ্রুপটির প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার শ্রমিক সরাসরি কাজ করছে, যা বেসরকারি পর্যায়ে সর্বোচ্চ। বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গ্রুপের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। গ্রুপের বার্ষিক টার্নওভার ২.৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

বর্তমানে বিশ্বের পাঁচটি ভৌগলিক অঞ্চল: দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় প্রাণের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ভারত, ওমান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সোমালিয়ায় নিজস্ব অফিস, গুদাম ও অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রাণের নিজস্ব বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র রয়েছে।

বিদেশের মাটিতে ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সম্প্রতি ভারতেও নিজস্ব কারখানা চালু করেছে গ্রুপটি।

 

আরও পড়ুন



Arthobazar